প্রশ্ন:
মানুষ কি মৃত্যুর পর পুনরায় এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করবে অর্থাৎ মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম লাভের কোনো ধারণা বা বিশ্বাস ইসলামে গ্রহণযোগ্য কি না ? এ বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী ?
উত্তর:
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
حَامِدًا وَّمُصَلِّيََا وَّمُسَلِّمًا أمّٰا بَعَدْ
ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম অর্থাৎ বারবার পৃথিবীতে ফিরে আসার বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও ঈমান বিধ্বংসী। যদি কোনো মুসলমান এ ধরনের আকীদা পোষণ করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ পুনর্জন্মের বিশ্বাস কিয়ামত, হাশর, পুলসিরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। অথচ এসব বিষয়ে ঈমান আনা প্রতিটি মুসলমানের জন্য আবশ্যক ও অপরিহার্য। কুরআন ও হাদীসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে মানুষ মৃত্যুর পর কিয়ামতের দিনে পুনরায় জীবিত হবে, হাশরের ময়দানে উপস্থিত হয়ে হিসাব দেবে, তারপর আমল অনুসারে জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। সুতরাং কোনো মুসলমানের জন্য পুনর্জন্মে বিশ্বাস রাখার কোনো সুযোগ নেই।
তদুপরি, বাস্তবতা ও যুক্তির দিক থেকেও পুনর্জন্মের ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
১. ইতিহাস ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অনুসারে, পৃথিবীতে সৃষ্টির ধারাবাহিকতা হলো- প্রথমে গাছপালা, তারপর প্রাণী এবং শেষে মানুষ। সুতরাং মানুষের কোনো পূর্বজন্ম থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
২. যদি আত্মার পুনর্জন্ম সত্য হতো, তবে পৃথিবীতে জীবের সংখ্যা কখনো বাড়ত না; বরং সমান থাকত বা ধীরে ধীরে কমে যেত। কারণ একই আত্মা বারবার জন্ম নিলে নতুন প্রাণের সংখ্যা বাড়ার কথা নয়। বাস্তবে দেখা যায়, পৃথিবীতে জীবের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৩. জন্ম ও মৃত্যুর হারের মধ্যেও রয়েছে বিশাল পার্থক্য, প্রতিদিন কোটি কোটি নতুন প্রাণ জন্ম নিচ্ছে, অথচ মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অতএব, মৃত্যুর পর মানুষ পৃথিবীতে ফিরে আসে না; বরং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন হিসাব-নিকাশের জন্য এটাই একমাত্র সত্য ও চূড়ান্ত বিশ্বাস।
زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَن لَّن يُبْعَثُوا ۚ قُلْ بَلَىٰ وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ ۚ وَذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
১.অর্থ: কাফেররা দাবি করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বলুন, অবশ্যই হবে, আমার পালনকর্তার কসম, তোমরা নিশ্চয় পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমাদেরকে অবহিত করা হবে যা তোমরা করতে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। (সূরা তাগাবুন: আয়াত নং ৭)
حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ [٢٣:٩٩]لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ ۚ كَلَّا ۚ إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا ۖ وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ
২.অর্থ: যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন
সে বলেঃ হে আমার পালনকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে) প্রেরণ করুন যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। কখনই নয়, এ তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে কবরের জগত আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। (সূরা মুমিনূন: আয়াত নং ৯৯ ও ১০০)
إِنَّ إِلَيْنَا إِيَابَهُمْ. ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا حِسَابَهُم.
৩.অর্থ: নিশ্চয় তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট, অতঃপর তাদের হিসাব-নিকাশ আমারই দায়িত্ব। (সূরা গসিয়া: আয়াত নং ২৫ ও ২৬)
يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِّيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ. فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ . وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ.
৪.অর্থ: সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে প্রকাশ পাবে,যাতে তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো হয়। অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে। (সূরা যিলযাল: আয়াত নং ৬ ও ৮)
حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ بَحِيرٍ، أَنَّهُ سَمِعَ هَانِئًا، مَوْلَى عُثْمَانَ قَالَ كَانَ عُثْمَانُ إِذَا وَقَفَ عَلَى قَبْرٍ بَكَى حَتَّى يَبُلَّ لِحْيَتَهُ فَقِيلَ لَهُ تُذْكَرُ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ فَلاَ تَبْكِي وَتَبْكِي مِنْ هَذَا فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” إِنَّ الْقَبْرَ أَوَّلُ مَنَازِلِ الآخِرَةِ فَإِنْ نَجَا مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ ” . قَالَ وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” مَا رَأَيْتُ مَنْظَرًا قَطُّ إِلاَّ وَالْقَبْرُ أَفْظَعُ مِنْهُ
৫.অর্থ: উসমান (রা.)-এর মুক্তদাস হানী বলেন, উসমান (রা.) কোন কবরের পাশে দাড়িয়ে এত কাঁদতেন যে, তার দাড়ি ভিজে যেত। তাকে প্রশ্ন করা হলো, জান্নাত জাহান্নামের আলোচনা করা হলে তো আপনি এতো কাঁদেন না, অথচ কবর দেখলে এত বেশি কাঁদেন কেন? তিনি বললেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আখেরাতের মনযিলসমূহের মধ্যে কবর হলো প্রথম মনযিল। এখান হতে কেউ মুক্তি পেয়ে গেলে তবে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলোতে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয়ে যাবে। আর সে এখান হতে মুক্তি না পেলে তবে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলো আরো বেশি কঠিন হবে। তিনি (উসমান) বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেনঃ আমি কবরের দৃশ্যের চাইতে অধিক ভয়ংকর দৃশ্য আর কখনো দেখিনি। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩০৮ সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪২৬৭ হাদীসের মান: হাসান)
وهو تصديق” ….. الوحدانية والنبوية والبعث والجزاء
৬.অর্থ: ঈমান বলা হয় আল্লাহর একত্ববাদ নবী (ﷺ) এর নবুওয়াত পুনরুত্থান দিবস এবং প্রতিদান দিবসকে বিশ্বাস করা। (ফতোয়ায়ে শামী: ৬/৩৪২ আশরাফিয়া)
وَاللّٰهُ أعْلَمُ باِلصَّوَابْ
উত্তর প্রদানে-মোঃ আবু সাঈদ।
শিক্ষার্থী: মানহাল ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার।
উত্তর নিরীক্ষণে: মুফতি রায়হান জামিল।
পরিচালক: মানহাল ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার।
Leave a Reply